সরকার মার্চেন্ট বিদ্যুৎ নীতি গ্রহণ করবে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, ‘বিনিয়োগকারীরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন ও তারাই বিক্রির জন্য গ্রাহক নির্ধারণ করবেন। সরকার স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) থেকে সরে আসতে চায়। আইপিপি থেকে ১০-২০ শতাংশ বিদ্যুৎ কেনা হবে। কারণ সরকার আইপিপির ক্রেতা হওয়ায় এখন টাকা দিতে পারছে না।’
রাজধানীর পল্টনে গতকাল অর্থনীতি বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে অভ্যন্তরীণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন তিনি। ইআরএফ, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ, কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) ও বিডব্লিউজিইডি যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। এ খাতে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ নেই বললেই চলে। তাই নতুন নীতিতে এ খাতে অর্থায়নের পাশাপাশি সোলার প্যানেল স্থাপনের জায়গা ও সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে সরকার।’
ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৩ লাখ কোটি টাকা, এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ঋণ কত প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঋণ দিতে এগিয়ে আসেনি। তারা ব্যালান্স শিটনির্ভর অর্থায়নে মগ্ন। এসব ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় লাঞ্চ বা ডিনারে বসে। সম্প্রতি বেক্সিমকো ও এস আলমের কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না। তাদের ব্যালান্স শিট ফাঁকা। অথচ তাদের খেলাপি ঋণই বেশি। তাই ব্যালান্স শিটনির্ভর ঋণ দেয়া কতটা যৌক্তিক।’
ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাংক কেন অর্থায়ন করছে না, এ সমস্যা সমাধানে বিগত সরকার আন্তরিক ছিল না। এমনকি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার হোক তাও চায়নি। তাই অর্থায়নে সমস্যা রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন নীতির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করবে।’
ব্যাংকগুলোকে সম্পদ বিবেচনা করে ঋণ অনুমোদন করার পরামর্শ দেন জ্বালানি উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য শক্তি ছাড়া দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকার রেল, সড়কসহ বিভিন্ন খাতের অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করবে। এজন্য শিগগিরই একটি নীতিমালা করা হবে।’
ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটুক, এটি আগের সরকার আন্তরিকভাবে চায়নি। এজন্য তখন সোলার প্যানেল স্থাপনের জায়গা নেই—এমনটা বলা হতো, এটি ভ্রান্ত ধারণা। বরং ইকোনমিক জোন নির্মাণের নামে সাধারণ মানুষের জমি জোর করে অধিগ্রহণ করলেও সেখানে কিছুই করা হয়নি। আমরা এটা বন্ধ করতে চাচ্ছি। অব্যবহৃত জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তবে এ খাতের ইকুইপমেন্ট আমদানি শুল্ক কমানো হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার জন্য সরকার এ খাতে শুল্ক বজায় রাখবে।’
অর্থায়ন সংকট ও কারিগরি প্রযুক্তির অভাবও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত সমস্যা কোথায়, সেটি চিহ্নিত করা দরকার। বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে রেল, সড়কসহ বিভিন্ন খাতের অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করবে।’
সেমিনারে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন সহজ করতে বিশ্বব্যাপী ১৮ ধরনের ঋণ ইনস্ট্রুমেন্ট অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে শুধু নন কনসেশনাল ঋণ দেয়া হয়। ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট বাড়াতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগ আসার পথ সুগম করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের চেয়ারপারসন গৌরাঙ্গ নন্দী। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহজে অর্থায়নের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন।
ইআরএফের সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধার সভাপতিত্বে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় আরো বক্তব্য দেন দ্য সিটি ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ও কান্ট্রি বিজনেস ম্যানেজার মো. আশানুর রহমান, ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী প্রমুখ।